শুরু করতে হবে নিজ ঘর থেকেই

শুরু করতে হবে নিজ ঘর থেকেই

যা কিছু মহান সৃষ্টি চির- কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর!

বহু যুগ আগে কবি লিখে গেছেন নারী পুরুষের সমতার কথা, সম অবদানের কথা , কিš‘ এই এক বিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও কি আমরা হলফ করে বলতে পারছি নারী পুরুষে সমতা এসেছে?

এই সমতার কাজ আমাদের শুরু করতে হবে ঘর থেকেই। এখনো বাবা মায়েরা ছেলে ও মেয়ে সন্তানের মাঝে প্রভেদ করে থাকেন। এখনো অনেক পরিবারে নারী গর্ভবতী হলে তার শশুর শাশুরী, আত্মীয় স্বজন এমনকি তার স্বামীও আশা করে একটি পুত্র সন্তান হবে। এখনো একটি পুত্র সন্তানের আশায় একজন নারীকে একে একে ৬/৭ টি সন্তানের জন্ম দিতে হয়,এবং তারপরও যদি পুত্র সন্তান না হয় তার জন্যও নারীকেই দোষারোপ করা হয়। এখনো মনে করা হয় একটি ছেলে হলো বংশের প্রদীপ, একটি মেয়ে তা নয়।

ছেলে মেয়ের মাঝে প্রভেদ গড়ে দেয় পরিবার থেকে শুরু করে আমাদের সমাজ। একই পরিবারে একটি ছেলেকে যতটা স্বাধীনতা দেয়া হয়, একটি মেয়ের বেলায় তা নয়, আবার একজন মেয়েকে যতটা কৈফিয়ত দিতে হয়, একজন ছেলের বেলায় তা নয়। তাই পরিবারের ছেলে সন্তান টি খুব সহজেই বুঝে যায় তার স্বাধীনতা তার ক্ষমতা মেয়ে সন্তানটির চেয়ে অনেক বেশি। পক্ষান্তরে মেয়ে সন্তানটি নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকে। আর এভাবেই সমাজে নারী পুরুষের রৈষম্য তৈরী হয়। আর বড় হয়ে ছেলেটি (যখন পুরুষ হয়) তার স্বাধীনতা উপভোগ করে, ক্ষমতা দেখায় দুর্বল নারীর প্রতি, (পুরুষের চোখে নারী দুর্বল)।

এখানে আমি আমার খুব কাছের একজন মানুষের কথা বলবো, তার পরিবারের কথা বলবো।
অরুনিমা (ছদ্মনাম) আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল। ৮ম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে ওর সাথে আমার পরিচয়। অরুনিমা বেশ ভালো ছাত্রী ছিল, তার চেয়েও বেশি ভালো মানুষ ছিল। আমাদের স্কুলের পাশেই ছিল ওদের বাড়ি । ওরা ২ বোন ৩ ভাই, বাবা মা শিক্ষিত ছিল। আমি প্রায়ই ওদের বাড়িতে যেতাম, ্ওর বাবা পুরুষের কর্তৃত্ব নিয়ে ওর মাকে তুই সম্বোধন করতো অরুনিমা আমর সামনে লজ্জিত হতো।

আমরা দুজনেই বই পড়তে ভালেবাসতাম, স্কুলের পাশেই একটি পাবলিক লাইব্রেরী ছিল যেটি ছুটির দিনেও খোলা থাকতো। স্কুলে কখনো লম্বা ছুটি থাকলে আমি লাইব্রেরীতে বই পড়তে যেতাম এবং অরুনিমাকে সঙ্গে নেয়ার জন্য প্রথমে ওদের বাড়িতে যেতাম। ওর বাবা প্রায়ই ওকে যেতে দিত না, প্রশড়ব করতো আমরা কী বই পড়বো ইত্যাদি, আবার কখনো কখনো যেতে দিত তবে বলে দিত ঠিক এক ঘন্টা পর ফিরে যেতে হবে। অরুনিমার বাবা কখনো বাড়িতে না থাকলে তার ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হতো, ছোট ভাইও বাবার মতোই সময় বলে দিত। ওর ছোট ভাইও বই পড়তো, তাকে আমি ঘন্টার পর ঘন্টা লাইব্রেরীতে কাটাতে দেখেছি, তার বেলায় কোন বিধি নিষেধ ছিল না।

৯ম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময় থেকে অরুনিমার বাবা ওর বিয়ের জন্য পাত্র খোঁজা শুরু করলো। তার যুক্তি ছিল মেয়েকে বেশি পড়ালেখা করিয়ে কোন লাভ নেই সে তার স্বল্প আয় তার ছেলেদের পিছনে খরচ করবে, তাদের ভালো জায়গায় পড়ালেখা করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করবে।

উ”চ মাধ্যমিকে পড়ার সময় ওর বাবা ওর চেয়ে ১০ বছরের বড় একজন ভালো পাত্র (বাবার চোখে ভালো পাত্র) খুঁজেও পেল এবং তার সাথে অরুনিমার বিয়ে দিয়ে দিল। একটি সমম্ভাবনার মৃত্যু হলো!
১ বছর পর অরুনিমা গর্ভবতী হলো এবং সন্তান প্রসব করতে গিয়ে তার জীবন প্রদীপ নিভে গেল।
সন্তানের মৃত্যুতে অরুনিমার বাবা নিশ্চয়ই কষ্ট পেয়েছিল, তবে কিছুটা সুখও হয়তো সে পেয়েছিল কারণ অরুনিমার সন্তানটি ছিল, পুত্র সন্তান।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়, ১ বছর পর অরুনিমার চেয়ে ৫ বছরের ছোট বোনটির বিয়ে দেয়া হলো তারই বরের কাছে।

তাই বলছি শুরু করতে হবে নিজ ঘর থেকেই। নারীকে শুধু নারী নয়, মানুষ বলে মূল্যায়ন করতে শিখতে হবে। সব পুরুষই কোন না কোন পরিবারেই জন্ম নেয়, বেড়ে উঠে, তাই ঘরের শিক্ষাটা হতে হবে সঠিক ও সুন্দর।

নাজমা খাতুন
ফোকাল পয়েন্ট

leave a comment