প্রতিবাদ শুরু করুন, লুকানো বন্ধ করুন

দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে কর্মস্থলে নারীর উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় উন্নয়ন এবং ক্ষমতায়নের পাশাপাশি নারীরা যেমন এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনী নারীদের নির্যাতন ও যৌন হযরাণীর শিকার হওয়ার ঘটনাও ভয়াবহ আকারে বাড়ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা লজ্জা, চাকরি হারানোর ভয়, মান-সম্মান হারানোর ভয়ে এই বিষয়গুলো বার বার এড়িয়ে যান। হয়রাণী বা নির্যাতন সহ্যের সীমা অতিক্রম না করা পর্যন্ত নারীরা সাধারণত বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেন না। আর এই হয়রানী মেয়েদের অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হওয়ার পথে এক বিরাট বাধা। কিন্তু কেন? কারণ আমরাই! মেয়েরাই মেয়েদের আসল শত্রুু। কারণ এ দেশের সমাজ ব্যবস্থা ও অধিকাংশ মানুষের রক্ষণশীল মানসিকতা, যখন কোন নারী হয়রানীর শিকার হন তখন এই সমাজ ও আমরাই তার পোষাক-আষাক, চলাফেরা, চরিত্রের দিকে নির্লজ্জের মত বাজে ইঙ্গিত করি। যৌন হয়রানীর অভিযোগের প্রত্যুত্তরে উত্তেজক কাপড় পড়ার অভিযোগ তো মেয়েদের শুনতে হয় অহরহ। ঘটনার শিকার নারীকে নানানভাবে প্রশ্নতুলে ঠাট্টা করে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করি। আর এই সবকিছুর বদৌলতে পার পেয়ে যাচ্ছে কিছু অসাধু ব্যক্তি। যাদের বেশির ভাগই ক্ষমতার জোরে তাদের নারী সহকর্মীর উপর নিয়মিতভাবে হয়রানী চালিয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ নারী লোক লজ্জা বা আরও হয়রানীর ভয়ে এ নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চাওয়া থেকে বিরত থাকে। তাই দাঁতে দাঁতে চেপে কাজ করে যায় বেশির ভাগ কর্মজীবী নারী। না পারলে চাকরি ছেড়ে দেয়। একশন এইডের ১টি হিসাব অনুযায়ী কেবল ঢাকা শহরেই ৭৮ ভাগ নারী যৌন হয়রানীর শিকার হয় যার মধ্যে কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, যানবাহন। আমাদের দেশের জিডিপি উন্নয়নে শতকরা ৩৪ ভাগ আসে কর্মজীবী নারীর অবদান থেকে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ১৮.৪ মিলিয়ন নারী শ্রম-বাজারের সাথে যুক্ত। এই বিশাল সংখ্যক নারী তার কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ না। গার্মেন্টেসের কর্মজীবী নারীদের উপর জরিপ করে দেখা গেছে ২.২% মেয়ে যৌন হয়রানীর প্রতিবাদ করে। তাহলে কি বেড়েই চলবে কর্মজীবী নারীদের প্রতি এই হয়রানির মাত্রা? কোন কি সুরাহা নেই? ২০০৯ সালের ১৪ই মে মহামান্য হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি নিয়ে একটি নীতিমালা তৈরী করে। কিন্তু সেটা কর্মক্ষেত্রে নারীদের হয়রানি বন্ধ করতে পারে নি। বাংলাদেশে নারী আন্দোলন রয়েছে বটে, কিন্তু নাগরীক চৈতন্যে তার কোন প্রভাব পড়েছে, সে কথার কোন প্রমান নেই। এত দিনে আরও একটা জিনিস স্পষ্ট হয়েছে। যৌন হয়রানি অথবা অন্য যে কোন প্রশ্নে নিজেদের অধিকার আদায় করার এই লড়াইটা নারীদের একাই লড়তে হবে। উদার আধুনিক পুরুষেরা কবে পুরোনো সংস্কার ঝেড়ে ফেলে নারীদের সঙ্গে হাত মেলাবেন, সেই পরিবর্তনের জন্য যদি অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে দিল্লি দুর হস্ত। ফলে লড়তে হবে নারীদের নিজেদের। নতুন যে লড়াইয়ে নারীরা নেমেছেন, তার লক্ষ্য একদিকে ব্যক্তিগত আত্মসম্মান উদ্ধার, অন্যদিকে সামাজিকভাবে নিজের জায়গা করে নেওয়া। নারীর যৌন হয়রানি ঠেকাতে হলে ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সেটা ঘটবেনা যতক্ষণ না নারীরা নিজেরাই ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু সেই পরিবর্তন যত দিন না হচ্ছে, তত দিন নারীরা কি মুখ বুজে বসে থাকবেন? নারীবাদী লেখক সারাহ সেলজার জবাব দিয়েছেন, মোটেই না। নারীদের প্রতি তার পরামর্শ; চুপ করে থাকবেন না, প্রতিবাদ করুন। সব হয়রানির কথা একে অপরকে জানান। জোট বাঁধুন, সামাজিক তথ্য মাধ্যমে মত বিনিময়ে অংশ নিন। কর্মক্ষেত্রে প্রতিটি নারীকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। যৌন নিপীড়নের ঘটনা কর্মক্ষেত্রে গোপন রেখে অপরাধীকে প্রশ্রয় না দিয়ে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব পরিহার, জোরালো ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ, যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ-ই পারে কর্মক্ষেত্রে নারী বান্ধব, সুস্থ এবং সৃজনশীল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে।

Dil Afroze Mila, Branch Manager

Micro-finance, SAJIDA Foundation

leave a comment