পথ তৈরী করতে হয়, কথা বলতে হয়……

শব্দগুলি সুন্দর – আদর ! স্পর্শ ! কিন্তু মন্দ আদর? নোংরা স্পর্শ? বড় হওয়া বুঝে ওঠার আগেই যখন আদরের নামে  বালিকাবেলায় মনের গভীরে জখম হয় কেউ জানে না! শৈশব কৈশোরের এসব দাগ মনের ভেতর আলোড়ন তুলে কিন্তু  মায়ের কাছে বলবে ভেবে কি এক সংকোচে বলা হয় না মেয়েটির। বাসায় কেউ নেই, এ সময় দরজায়  বেল শুনে দৌড়ে যেয়ে পরিচিত আত্মীয়কে সাদরে বসতে দেয় বছর পনেরোর কিশোরীটি। মা তাকে শিখিয়েছেন অতিথির সাথে সুন্দর আচরণ করতে।  কিন্তু টিভি দেখতে পাশে বসে অতিথির নোংরা স্পর্শ ! কী আতংক ! কী বিচ্ছিরি সেই মুহূর্ত!

নিজেকে স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন ও ইচ্ছা প্রবল ছিল, সাথে ছিল মা- বাবা – পরিবার। ছোট মেয়ে হিসেবে সকল সময়ে স্নেহ – ভালোবাসায় সিক্ত ছিলাম। কি কারণে জানিনা ছেলে- মেয়ে বৈষম্য ব্যাপারটা মেনে নেয়া বা মানিয়ে নেয়ার কথাটা শুনলেই প্রবল ক্রোধ হতো। পড়াশুনার ক্ষেত্রে চিকিৎসক নিজের পছন্দে ,যেখানে বৈষম্য আসে না।  আসলে কি তাই?

অনেক সহপাঠীনিকে দেখেছি একই পেশার মানুষের সাথে ঘর বেঁধে সমস্ত কিছু ‘ছাড় ‘ দিতে হয়েছে স্বামীর পড়া এগিয়ে নিতে আর নিজে শুধু সংসার সামলাতে। আমরা বাহবা দেই অঞ্জলি , শচীন টেন্ডুলকারের স্ত্রী হিসেবে সংসার আগলে রেখেছেন বলে অথচ তিনি একজন ‘ গোল্ড মেডেলিস্ট ‘ শিশু চিকিৎসক ছিলেন। হ্যা এতেই সমাজ তালি দেয় , সাধুবাদ জানায়। জীবন নিজের , তাকে চালানোর পছন্দ নিজের হতে হবে ।  বৈবাহিক অবস্থা জীবনবৃত্তান্তে অতীব গুরুত্বপূর্ণ কোন হিসেবে ??? এটা কি রকমের দক্ষতা প্রমান করে? মধ্যবয়স অব্দি এ জায়গাতে ‘সিঙ্গেল /অবিবাহিত’ তে টিক চিহ্ন দিতে যেয়ে কতগুলি চোখ ও প্রশ্ন আমায় বিদ্ধ করে তার হিসেবে নেই. একজন পুরুষ ‘মিসটার ‘ লিখে দিব্যি চলতে পারেন আর আমরা মিস/মিসেস/মিজ লিখে পুরুষের সাথে সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ দেখাতে  হয়!

কতরকমের  ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শুনেছি গুনে দেখিনি , আক্রমণাত্মক কথা  শুনেছি। আমি সব সময় নিজেকে মানুষ ভেবে এগিয়েছি। আমার মতন করে জীবনের সংজ্ঞা নিয়ে তাকে দেখতে আমার ভাল লাগে। কিশোর থেকে বৃদ্ধ চোখের চাহনী ও কৌতূহল মাড়িয়ে এতটা পথ এসেছি।এক সহকর্মী আমায় বলেছিলেন , আপা! আপনার সবদিক ভালো শুধু ওই ফেমিনিস্ট ভাবটা ঠিক না। ” আমি হেসে উত্তর দিয়েছিলাম ,” আপনার ওই কনজারভেটিভ দিকটা ছাড়া অন্য দিকগুলি খারাপ না , কাজ করা চলে। ”

আমাদের নারীদের সকল অর্জনকে মেধার সাথে অনুপাত না করে বাহ্যিক সৌন্দর্যের সাথে মিলায়  এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। যে সমাজে অশিক্ষা ও ধর্মান্ধতা প্রবল সেখানে একজন রিকশাচালক , বাসের হেলপার , কাপড় বিক্রেতা থেকে অফিসের বড়কর্তা বা নেতা সকলের কাছেই আমরা ‘মানুষ ” হিসেবে প্রাপ্য সম্মান পাই না : আমাদের সাজপোশাকে দিয়ে পুতুল বানিয়ে মনমত কথা বলাতে পারলে তবে ‘ ভাল মেয়ে /সংসারী  আর স্পষ্ট করে সরাসরি চোখ রেখে সত্যি কথা বললে উচ্চাভিলাষী / খারাপ। সমাজব্যবস্থা তার পীড়ন দিয়ে শৃঙ্খল দিয়ে নারীদের তার সুরে  নাচতে বলবে – একে কী সভ্য সমাজ বলা যায় ?সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দিকে তাকালে বিবমিষা হয় – এখানে ‘নারী” হচ্ছে চিড়িয়া / জিনিস। ধর্মের নাম করে নারীকে নিয়ত অবমাননা করা,অর্জনগুলি কে ম্লান করে দেয়া হয় বাজে শব্দ ব্যবহার করে।  যত ‘হেলপ লাইন ‘ আসুক না কেন সবচেয়ে বড় কথা আমাদের নীরবতা ভাঙতে হবে। নারীর প্রতি এই সামাজিক চাপ, হয়রানি ও সহিংসতার প্রতিবাদ করতে হবে। আমাদের সকলের একেকটা গল্প আছে যা আমাদের পীড়া দিয়েছে, আঘাত দিয়েছে , ক্ষতিগ্রস্ত করেছে শারীরিক ও মানসিকভাবে তার বিরুদ্ধে হাতে হাত রেখে দাঁড়াতে হবে উচ্চস্বরে বলতে হবে – আমায় অপমান করার অধিকার কারো নেই তা তুমি যত বড় পদেই আসীন থাকো না কেন। প্রতিরোধ করলে প্রতিকার হবেই  .যৌন হয়রানি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে পরিবার – বন্ধুমহল- কর্মক্ষেত্রে রুখে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই।  যে যার অবস্থা থেকে রুখে দাঁড়াই – জয় হবে, হতেই হবে। কারণ –

the most dangerous woman of all is the one who refuses to rely on your sword to save her because she carries her own.”

leave a comment